নিউইয়র্ক বললেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে আধুনিকতা, প্রযুক্তি, ব্যস্ত নগরজীবন আর বিশ্বের অন্যতম মুক্ত ও বৈচিত্র্যময় সমাজের ছবি।
কিন্তু সেই নিউইয়র্কের বুকেই এমন একটি সম্প্রদায় আছে, যারা আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে নিজেদের দূরত্ব বজায় রেখে শত শত বছরের পুরোনো ধর্মীয় বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও জীবনব্যবস্থাকে আঁকড়ে ধরে আছে।
রুহি চেনেতের ‘The World’s Most Secretive Jewish Community’ প্রামাণ্যচিত্রটি দেখার পর হাসিডিক ইহুদি সম্প্রদায় সম্পর্কে আমার ধারণাটা অনেকটাই বদলে গেল।
প্রায় ৪০ মিনিটের এই ভিডিওতে তিনি বিশেষ অনুমতি নিয়ে ব্রুকলিনের ক্রাউন হাইটসে অবস্থিত তাদের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কেন্দ্র ৭৭০ সিনাগগে প্রবেশ করেন।
সেখানে ঢুকেই যে দৃশ্যটি চোখে পড়ে, সেটি বেশ বিস্ময়কর।
শত শত তরুণ ধর্মীয় গান গাইছে, নাচছে, প্রার্থনা করছে এবং ধর্মীয় শিক্ষায় ব্যস্ত। তাদের জীবনযাপন দেখে মনে হয়, আধুনিক নিউইয়র্ক থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরত্বে থেকেও তারা যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পৃথিবীতে বসবাস করছে।
তাদের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বাস হলো মেসিয়াহর আগমন। এই বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে তাদের ধর্মীয় জীবন ও চিন্তাভাবনার একটি বড় অংশ পরিচালিত হয়।
সবচেয়ে বেশি অবাক করেছে প্রযুক্তির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক।
যে সময়ে পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছাড়া এক মুহূর্তও কল্পনা করতে পারে না, সেখানে এই সম্প্রদায়ের অনেকেই এসব থেকে নিজেদের দূরে রাখে।
কেউ কেউ এমনকি স্মার্টফোনের পরিবর্তে ব্যবহার করেন ‘কশার ফোন’,যেখানে কল করার মতো মৌলিক সুবিধা থাকলেও ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা বিভিন্ন আধুনিক অ্যাপ ব্যবহারের সুযোগ নেই।
ভিডিওতে এমন কিছু মুহূর্তও রয়েছে, যখন ক্যামেরা নিয়ে তাদের এলাকায় প্রবেশ করায় স্থানীয়দের আপত্তির মুখে পড়তে হয়।
আরেকটি বিষয় বেশ চোখে পড়ার মতো,তাদের পারিবারিক কাঠামো।
বড় পরিবার তাদের সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। অনেক পরিবারেই সন্তানের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামাজিক কাঠামোর কারণে তাদের জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তাদের পোশাকও আলাদা করে নজর কাড়ে।
পুরুষদের কালো পোশাক, টুপি এবং কানের পাশে লম্বা চুল বা পেয়োট তাদের স্বতন্ত্র পরিচয়ের অংশ। অন্যদিকে বিবাহিত নারীরা চুল ঢেকে রাখেন এবং অনেকে উইগ ব্যবহার করেন।
একটি উইগের দাম কয়েক হাজার ডলার পর্যন্ত হতে পারে,এই তথ্যটিও বেশ অবাক করার মতো।
তবে হাসিডিক সমাজকে শুধু পোশাক কিংবা ধর্মীয় বিশ্বাস দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়।
তারা নিজেদের জন্য একটি শক্তিশালী সামাজিক কাঠামো তৈরি করেছে। নিজেদের ভাষা ইদ্দিশ, নিরাপত্তার জন্য Shmira, জরুরি চিকিৎসার জন্য Hatzalah এবং ধর্মীয় বিরোধ মীমাংসার জন্য Beth Din,সব মিলিয়ে তাদের জীবনব্যবস্থার অনেক ক্ষেত্রেই নিজস্ব প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
রুহি চেনেত যখন একজন রাবাইয়ের বাড়িতে গিয়ে তাদের পারিবারিক জীবন দেখান, তখন বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে তাদের Kosher Kitchen বেশ আকর্ষণীয়।
মাংস ও দুগ্ধজাত খাবারের ধর্মীয় বিধি আলাদা হওয়ায় অনেক পরিবারে রান্নার সরঞ্জামও আলাদা রাখা হয়। এমনকি আলাদা ওভেন, মাইক্রোওয়েভ কিংবা ডিশওয়াশার ব্যবহারের বিষয়টিও দেখা যায়।
এরপর আসে Shabbat।
শুক্রবার সূর্যাস্ত থেকে শনিবার সূর্যাস্ত পর্যন্ত তাদের ধর্মীয় নিয়মকানুন এতটাই কঠোর যে দৈনন্দিন জীবনের অনেক স্বাভাবিক কাজও এ সময় করা হয় না।
বিদ্যুৎ ব্যবহার থেকে শুরু করে গাড়ি চালানো—সবকিছুর ক্ষেত্রেই রয়েছে নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ। প্রয়োজনীয় কিছু ব্যবস্থা আগে থেকেই টাইমারের মাধ্যমে পরিচালনা করা হয়।
আর Eruv ব্যবস্থাটি তো আরও কৌতূহলোদ্দীপক। নির্দিষ্ট ধর্মীয় সীমারেখার মাধ্যমে এমন একটি কাঠামো তৈরি করা হয়, যার কারণে শাবাতের দিনে কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস বহনের বিধানগত সুযোগ তৈরি হয়।
প্রামাণ্যচিত্রের সবচেয়ে রহস্যময় অংশগুলোর একটি হলো ৭৭০ সিনাগগকে ঘিরে টানেলের ঘটনা।
২০২৪ সালে সিনাগগের দেয়াল ভেঙে একাধিক ভবনের সঙ্গে যুক্ত একটি গোপন পথ আবিষ্কৃত হওয়ার পর বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় আসে। সেখানে ম্যাট্রেস, পোশাকসহ বিভিন্ন সামগ্রী পাওয়ার কথাও উঠে আসে।
তবে পুরো ঘটনাটি নিয়ে নানা বিতর্ক ও আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে। ফলে বিষয়টিকে শুধু ‘রহস্যময় টানেল’ হিসেবে দেখার চেয়ে এর পেছনের বাস্তব ঘটনা ও প্রেক্ষাপটও বিবেচনা করা জরুরি।
প্রামাণ্যচিত্রের শেষদিকে সম্প্রদায় ছেড়ে বেরিয়ে আসা একজন সাবেক সদস্যের অভিজ্ঞতা দেখানো হয়।
এই অংশটি আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে।
কারণ এখানে শুধু একটি সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য ও ধর্মীয় অনুশাসন নয়, বরং সেই কাঠামোর ভেতরে বেড়ে ওঠা এবং পরে সেখান থেকে বেরিয়ে আসার অভিজ্ঞতাও সামনে আসে। পরিবার, সন্তান, সামাজিক সম্পর্ক ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপর এর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে—তার একটি ভিন্ন দিক দর্শক এখানে দেখতে পান।
সব মিলিয়ে, প্রামাণ্যচিত্রটি শুধু হাসিডিক ইহুদিদের নিয়ে একটি ভিডিও নয়; এটি মূলত একটি প্রশ্ন সামনে আনে—আধুনিক পৃথিবীর কেন্দ্রস্থলে থেকেও একটি সম্প্রদায় কীভাবে নিজেদের জন্য প্রায় আলাদা একটি পৃথিবী তৈরি করে শতাব্দীর পর শতাব্দী নিজেদের বিশ্বাস ও জীবনধারা ধরে রাখতে পারে?
নিউইয়র্কের মতো আধুনিক মহানগরের ভেতরে এমন একটি জীবনব্যবস্থা যে এখনও এত শক্তিশালীভাবে টিকে আছে, সেটিই আমার কাছে এই প্রামাণ্যচিত্রের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক।
ভিডিওটি দেখার পর মনে হয়েছে, পৃথিবীকে বুঝতে হলে শুধু বড় শহরগুলোকে দেখা যথেষ্ট নয়; সেই শহরের ভেতরে নিজেদের মতো করে বেঁচে থাকা ছোট ছোট সমাজগুলোকেও বুঝতে হয়।
রুহি চেনেতের এই প্রামাণ্যচিত্রটি সেই অচেনা জগতের দরজায় অন্তত ৪৮ ঘণ্টার জন্য দর্শককে দাঁড় করিয়ে দেয়।
