আগে মানুষ একে বলত অহংকার। এখন সেটার নাম হয়ে গেছে ‘সেলফ কেয়ার’!
আগে যেটাকে খারাপ আচরণ বলা হতো, এখন সেটাকে বলা হয় ‘বাউন্ডারি’!
আগে কেউ সত্য কথা বলত, কষ্টের কথা, এমন কিছু যা শোনা দরকার ছিল কিন্তু শুনতে ভালো লাগত না। এখন সেই কথাকে বলা হয় তুমি আমাকে ‘গ্যাসলাইট’ করছো। আমি গ্যাসলাইটেড হচ্ছি।
এভাবে আমরা আস্তে আস্তে একটা জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে নিজের ভালো লাগা সবচেয়ে বড় নীতি।
আমাকে ভালো লাগলে সেটা ঠিক। আমাকে অস্বস্তিতে ফেললে সেটা টক্সিক। আমার মুড ভালো থাকাটা চূড়ান্ত লক্ষ্য। যা আমার মুডের পথে দাঁড়াবে, সেটা সমস্যা।
এখানেই গল্পটা একটু ভিন্ন হয়।
আজ থেকে একশো বছর আগে, কেউ ভেতর থেকে ভেঙে পড়লে সে সাধারণত দুই জায়গায় যেত। ধর্মের দিকে। অথবা দর্শনের দিকে। মানুষ আল্লাহর কাছে ফিরত, দুআ করত, সেজদায় কাঁদত। অথবা দার্শনিকদের প্রশ্ন করত, কষ্ট কী, দুঃখ কেন আসে, এই দুনিয়ার মানে কী।
আস্তে আস্তে এই দুই জায়গা সরিয়ে এক নতুন জগৎ সামনে এল, নাম সাইকোলজি।
মানুষ বলল, আমার কষ্টের উত্তর আধ্যাত্মিকতায় না, আমার কষ্টের উত্তর সাইকোলজিতে। কেন আমি কাঁদি, কেন আমি রাগি, কেন আমি ভেঙে পড়ি, কেন মানুষ আমাকে এমন আচরণ করে। এগুলো শোনার একজন থেরাপিস্ট থাকবে।
সাইকোলজি আসলে ছোট কিছু না। এইটা আরেক দুনিয়া। সোশ্যাল সাইকোলজি, পার্সোনালিটি সাইকোলজি, অ্যাবনরমাল সাইকোলজি। হাজার হাজার মানুষ এই নিয়ে জীবন কাটিয়েছে। মানুষের মনের ভেতর কী চলছে, আনকনশাসে কী জমে আছে, কেন আচরণ এমন হয়ে যায়। এটা একটা সিরিয়াস পড়াশোনা।
কুরআনও বলে, আল্লাহ মানুষকে নিজেকেই দেখান। ভেতরের দিক দেখান। তাই নিজের ভেতরটা বোঝা নিজেই খারাপ কিছু না। সমস্যা হচ্ছে, এই বোঝার যাত্রা থেকে আল্লাহকে বাদ দিয়ে দেওয়া হলো।
মানে, মন আছে কিন্তু মালিক নেই। অনুভূতি আছে কিন্তু উদ্দেশ্য নেই।
এখানেই এক নতুন বিপদ ঢুকে গেল।
আগে বিজ্ঞান শেখাতো কীভাবে আগুন জ্বালাতে হয়। এখন একই বিজ্ঞান শেখায় কীভাবে রাসায়নিক দিয়ে পুরো একটি শহর ধ্বংস করতে হয়। বিজ্ঞান যখন উদ্দেশ্য হারায়, তখন সেই বিজ্ঞান থেকে ওষুধও বের হয়, আবার নেশাও বের হয়।
মন বোঝার বিজ্ঞান, যদি আল্লাহকে সরিয়ে নেয়, তখন সেই মন কার কথা শুনবে? কে ঠিক আর কে ভুল সেটার বিচার করবে কে? তখন একটাই জিনিস বাকি থাকে। আমার অনুভূতি।
তারপর আরও এক ধাপ হলো সোশ্যাল মিডিয়া।
ধরুন ফিজিক্স। আসল ফিজিক্স পড়ে যারা জীবন কাটিয়েছে, যাদের গবেষণা আছে, পেপার আছে, হয়তো তাদের ইউটিউব চ্যানেলই নেই।
আর একজন আছে যার বয়স আঠারো, দুটো বই পড়েছে, আর তার কয়েক মিলিয়ন ফলোয়ার। মানুষ আসল গবেষককে শুনে না, শোনে যাকে শুনতে সহজ লাগে। যার কথা নাটকীয় শোনায়।
এটা সাইকোলজির সাথেও হলো।
একদিক আছে আসল গবেষণা, বছরখানেকের থেরাপি এক্সপেরিয়েন্স, জার্নাল আর ডেটা। আরেকদিকে আছে ফেসবুক একাউন্ট যেখানে কেউ বলছে, এইভাবে বুঝবেন কে নার্সিসিস্ট, এইভাবে ধরবেন কে টক্সিক, এইভাবে করবেন ট্রমা হিলিং, এইভাবে কাটবেন বাবার এনার্জি।
এখন এক কিশোর বলে, আমার বাবা টক্সিক। সে আমাকে গ্যাসলাইট করে। আমাকে নিজের বাউন্ডারি সেট করতে হবে। আমাকে হিল করতে হবে।
এভাবে এক সময় যা বলা হতো বেয়াদবি, এখন সেটা হলো সেলফ কেয়ার।
যা বলা হতো খারাপ আচরণ, এখন সেটার নাম বাউন্ডারি।
কেউ যদি আপনাকে সত্য কথা বলে, আপনার ভুল ধরিয়ে দেয়, আপনি বলেন এটা গ্যাসলাইটিং। আমি ট্রিগার্ড।
ফল কী দাঁড়াল?
আমরা এমন এক ভাষা বানিয়ে ফেললাম, যেখানে আমি সবসময় ভিকটিম। আর তুমি সবসময় অপরাধী।
“তুমি নার্সিসিস্ট। তুমি টক্সিক। তুমি আমার স্পেস ভেঙে দিচ্ছো।”
আমরা এই শব্দগুলোকে অস্ত্র বানিয়ে ফেললাম। অথচ আমরা নিজেই এই শব্দগুলোর গভীর মানে জানি না। শুধু জানি, আমি কষ্ট পেলেই তুমি দোষী।
এখানেই আমি থামি, আর একটা প্রশ্ন করি। কুরআন এ বিষয়ে কী বলে।
কুরআন এক জায়গায় বলে, যে বিপদ তোমার ওপর আসে, যে কষ্ট এসে লাগে, সেটা আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে না। মানে কেউ অসুস্থ হলো, কেউ চাকরি হারালো, সংসার ভেঙে গেল, পরিবার দূরে সরে গেল, ভাই আর ভাই কথা বলে না, সন্তান বাবাকে ঘৃণা করে, মা ঘর ছেড়ে চলে গেল।
এই ঘটনা যখন ঘটে, আল্লাহ বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপরে ঈমান ধরে রাখে, আল্লাহ তার হৃদয়কে পথ দেখান।
মানে কী?
মানে আমার মন হয়তো আগুনের মতো জ্বলছে। অন্যায় হয়েছে। অপমান হয়েছে। অবহেলা হয়েছে। কেউ আমাকে এমনভাবে আঘাত দিয়েছে যে সেটা মেনে নেওয়া কঠিন। মন বলছে বিচার দরকার, প্রতিশোধ দরকার। মন কাঁদছে, ভেঙে পড়ছে।
কুরআনের শিক্ষা হলো, সেই জায়গাতেই স্থির থাকা। সেই জায়গাতেই আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া।
মনকে বলা, এই কষ্ট আমাকে একা দেয়নি। আল্লাহ আমাকে দেখছেন। এই কষ্টটা শুধু ব্যথা না, এটা আমার ঈমানের পরীক্ষা। আর যদি আমি এই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকি, ভেঙে না পড়ি, বরং আল্লাহর দিকে ফিরি, তাহলে আল্লাহ নিজেই আমার হৃদয়কে শান্ত করতে শুরু করবেন।
মানে দুঃখ অস্বীকার না। দুঃখকে ব্যান্ডেজও না। দুঃখের ভেতর দাঁড়িয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া।
এটি খুব সহজ শোনায়, কিন্তু এইটাই আসলে ঈমানের শক্তি।
এই জায়গায় খেয়াল করুন, যারা আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় ছিলেন, সেই সব নবী। তাদের জীবনে এই দুঃখগুলো কাগজে লেখার মতো না, আগুনের মতো ছিল।
ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম। নিজের বাবার থেকেই প্রত্যাখ্যাত। নিজের ঘর থেকে বের করে দেওয়া হলো। তিনি কি বললেন, তুমি টক্সিক, তুমি নার্সিসিস্ট, তুমি আমার মানসিক সীমানা ভেঙে দিয়েছো, আমি তোমাকে জীবনে ব্লক করে দিলাম।
না।
তিনি ফিরে তাকিয়ে বাবাকে সম্বোধন করলেন স্নেহ নিয়ে। বললেন, আমি আপনার জন্য এখনও ভালো চাই। আমি আপনার জন্য ক্ষমা চাইব আল্লাহর কাছে। আপনি আমার প্রতি অন্যায় করলেন, তবুও আমি বদলে যাই না।
ইউসুফ আলাইহিস সালাম। ভাইয়েরা তাকে ধাক্কা মেরে কূপে ফেলে দিয়েছে। তারপর পরিবারকে মিথ্যে কথা বলেছে। তারপর তাকে চোর বলা হয়েছে, অপমান করা হয়েছে। আজকের ভাষায় বললে, এই সবই তো ট্রমা। এই সবই তো পরিবারের মধ্যে ম্যানিপুলেশন।
তারপরও তিনি দাঁত চেপে বললেন না, তোমরা সবাই টক্সিক, তোমাদের সাথে আমার সম্পর্ক শেষ। শেষ দিকে তিনি বলেন, আল্লাহ আমাকে কত সুন্দরভাবে দেখেছেন।
এই জায়গাটা আমাদের অস্বস্তিকর লাগে। কারণ আমরা শিখেছি, যার কারণে আমার কষ্ট হয়েছে, তাকে কেটে ফেললেই শান্তি। কিন্তু কুরআন বারবার মানুষের প্রতি দোষারোপ করে না, হৃদয়ের দিকটা ঠিক করে।
যখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হয়, এখন আমরা খুব সহজে বলে ফেলি, তুমি অ্যাবিউজার, তুমি গ্যাসলাইটার।
কুরআন কী শেখায়?
কুরআন বলে, যখন উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন তোমাদের জবাব এমন হোক যাতে আগুন না বাড়ে, বরং কমে। ইসলাম বলে, শয়তান দুই মানুষের মাঝে ফাটল ধরাতে চায়। তুমি সেই ফাটলটা বাড়াবে, না নরম করবে, সেটার সিদ্ধান্ত তোমার জবাবে।
মানে কুরআন কখনো বলে না যে সমস্যা নেই। কুরআন কখনো বলে না যে চুপ থাকো, কিছু সহ্য করো আর দেখাও না।
কুরআন বলে, পরিস্থিতিটা সামলাও সম্মানের সাথে।
যদি খুব বেশি দূর চলে যায়, তখন অন্তত শান্ত হয়ে সরে যাও, দরজা না ভেঙে। সম্পর্ক একদম শেষ করে ফেলার আগে চেষ্টা করো তা মেরামত করা যায় কিনা।
আরেকটা জায়গায় কুরআন বলে, পরিবারের ভেতরেও কখনো কখনো এমন অবস্থা তৈরি হতে পারে যে সে ব্যক্তি সত্যিই অন্যায়ের জায়গায় দাঁড়িয়েছে। এমনও হতে পারে যে সবচেয়ে কাছের মানুষটিই আপনার জন্য ক্ষতির দরজা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কুরআন এটাকে অস্বীকার করে না। কুরআন বলে, এটা বাস্তবতা।
কিন্তু এরপর কী বলে।
কুরআন বলে, যদি তুমি ক্ষমা করতে পারো, ঢেকে দিতে পারো, নতুন করে শুরু করতে পারো, তাহলে আল্লাহও তোমার জন্য দরজা খুলে দেবেন।
ক্ষমা মানে এই না যে যা হয়েছে তা হয়নি।
ক্ষমা মানে, আমি তোমাকে প্রতিদিন নতুন অপরাধী বানিয়ে রাখব না। আমি প্রতিদিন তোমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছি না গত বছর তুমি কী বলেছিলে। আমি প্রতিটি কথোপকথনের শুরুতেই বলছি না তুমি আমাকে কতবার ট্রমাটাইজ করেছো। আমি সেই পুরোনো জখমকে আমার অস্ত্র হিসেবে প্রতিদিন নতুন করে ব্যবহার করব না।
এটা খুব কঠিন। কিন্তু কুরআনের শিক্ষা হচ্ছে, এটাই শেষ নয়। এখনও ফিরে আসার রাস্তা আছে। এখনও সম্পর্ক বাঁচার রাস্তা আছে।
এটা আজকের জনপ্রিয় সাইকোলজি থেকে আলাদা।
আজকের ট্রেন্ড কী বলে? আমি যেমন ফিল করি সেটাই শেষ কথা। আমার ফিলিংসই আসল সত্য। আমার অস্বস্তি মানে তুমি অপরাধী। আজ তুমি নার্সিসিস্ট, কাল তুমি টক্সিক, পরশু তুমি এবিউসার। আমি তোমাকে লেবেল দিলাম। আমি ঘোষণা করলাম তুমি কে।
কুরআন বলে, মানুষের অন্তরকে তুমি এমনভাবে বিচার করার অধিকার পাও না। তুমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারো না কার মন আসলে কেমন। এই বিচার করার জায়গা তোমার না।
আমরা আজকে এই সীমা অতিক্রম করছি। আমরা শুধু আচরণ বিশ্লেষণ করছি না, আমরা মানুষের নফসকেই ঘোষণা করছি। তুমি খারাপ মানুষ, তোমার ভেতর নষ্ট, তুমি ঠিক হও না, তুমি এমনই, তুমি বদলাবে না।
এভাবে কথা বলা আমাদের খুব শক্তিশালী মনে হয়। আসলে এটা আমাদের ভয়ংকর দুর্বল করে দিচ্ছে।
কারণ যখন আমার অনুভূতিই আমার উপাস্য হয়ে যায়, তখন আর কার কথা শুনব। আল্লাহর কথা কেন শুনব। কার কাছে ফিরে যাব। কে আমার মনকে শাসন করবে।
কুরআন বলে, কিছু মানুষ আছে যারা তাদের নিজের নফসকেই তাদের ঈশ্বর বানিয়ে ফেলে। তাদের যা লাগে, সেইটাই সত্য। তাদের মুডই আইন। তাদের ক্ষোভই ন্যায়বিচার। তাদের কষ্টই মানদণ্ড।
সমস্যা হলো, যখন কেউ এই জায়গায় নেমে যায়, তখন তাকে বোঝানো যায় না। আপনি যত যুক্তি দেন, সে শুধু বলে, কিন্তু আমি এভাবে ফিল করি।
এই অবস্থাটা খুব ভয়ংকর। কারণ এখানে মানুষ আর পথনির্দেশ নিচ্ছে না, মানুষ পথটা নিজেই বানিয়ে নিচ্ছে।
তার বিপরীতে কুরআনের ডাক খুব আলাদা।
কষ্ট এলে পালিয়ে যেও না। কষ্ট এলে ভেঙে পড়ো না। কষ্ট ঢেকে রাখো না। কষ্টকে অস্ত্রও বানিও না।
কষ্টের মধ্যে দাঁড়িয়ে বলো, আল্লাহ তুমি আমাকে পথ দেখাও। আমার হৃদয় যেন তোমার হাতে থাকে, আমার আঘাত যেন আমাকে কুৎসিত না করে ফেলে।
আরেকটা জিনিস মনে রাখা দরকার। ইসলাম আমাকে অন্যের হৃদয় নিয়ে ফয়সলার লাইসেন্স দেয় না।
আমি কাউকে ধরে বলতে পারি না, তুমি ভেতর থেকে নষ্ট, তুমি শুধু ম্যানিপুলেটর, তুমি শুধু শয়তান। আমি নিশ্চিতভাবে জানি না তার ভেতরে কী চলছে। অনেক নবী এমন লোকদের সাথেও নরম কথা বলেছেন, যাদের কাজ ছিল ভয়ংকর। কারণ আল্লাহ বলেছেন, তুমি জানো না, হয়তো তার ভেতরে এখনো এমন কিছু বাকি আছে যা ফিরতে পারবে।
আমাদের নতুন ভাষা, নতুন শব্দ, নতুন লেবেল আমাদের খুব শক্তিশালী মনে করাচ্ছে। কিন্তু সাবধান। প্রতিটি লেবেল আসলে একটা ঘোষণা। তুমি শুধু কারো কাজকে সমালোচনা করছো না, তুমি তার অন্তরকে চূড়ান্ত রায় দিয়ে দিচ্ছো।
এই জায়গাটা ভাঙা উচিত।
নিজেকে বুঝতে চাও, ভালো কথা। নিজের মানসিক ক্লান্তি, নিজের ব্যথা, নিজের ভেঙে পড়া জায়গা চিনতে চাও, সেটাও ভালো কথা। কিন্তু নিজের কষ্টকে ইবাদত বানিয়ে ফেলো না। নিজের মুডকে সত্য বানিয়ে ফেলো না।
কারণ শেষ পর্যন্ত শান্তি কোনো লেবেলে না, কোনো শব্দে না, কোনো ট্রেন্ডি ডায়াগনোসিসে না। শেষ পর্যন্ত শান্তি সেই জায়গায়, যেখানে মানুষ কষ্টের মাঝেও আল্লাহর দিকে ফিরে যায় এবং বলে, আমার হৃদয়টা তুমি সামলাও।
