নবীজীর(ﷺ) যুগ থেকে সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন, তাবে-তাবেয়ীন এবং অদ্যাবধি ইসলামী উম্মাহর ইতিহাসে এক সুপ্রতিষ্ঠিত প্রথা ছিল—নারীরা পরপুরুষের সামনে চেহারা আবৃত রাখতেন। নবীজীর সকল বিবি এই নিয়মের ধারক ও বাহক ছিলেন। এভাবেই সাহাবা, তাবেয়ীন ও তাবে-তাবেয়ীন যুগের মধ্য দিয়ে দ্বীনদার নারীদের আমল ধারাবাহিকভাবে সংরক্ষিত হয়েছে।
দুর্ভাগ্যবশত, আধুনিক সময়ে কিছু সেকুলার সম্প্রদায় এই সুপ্রতিষ্ঠিত মাসআলায় বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করছে। তারা দাবি করে, ‘ইহুদি নারীরা যখন বেশ্যাবৃত্তি করতো অথবা অন্য কোনো নিষিদ্ধ কার্যক্রম করত তখন নিকাব পড়তো। হিজাব হলো মুসলমানের ড্রেস বাট নিকাব মুসলমানের ড্রেসই না।’
এই ধরনের মন্তব্য শুধু বিভ্রান্তিকর নয়, বরং নিকাবসহ ইসলামী প্রতীককে ব্যঙ্গ করার, মুসলিম নারীদের অপমান করার এবং ইসলাম বিদ্বেষীদের আনন্দিত করার চক্রান্ত। এটি সম্পূর্ণভাবে ইসলামের শাস্ত্রীয় ইতিহাস ও সাহাবায়ে কেরামের বাস্তব আমলের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ।
কুরআন ও জিলবাবের বিধান
কুরআন স্পষ্টভাবে নিকাব ও বোরকার বিধান
প্রতিষ্ঠা করেছে। সূরা আহযাবের ৫৯ নং আয়াতে ইরশাদ হয়েছে—“হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদের, আপনার কন্যাদের ও মুমিনদের নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের জিলবাবের একাংশ নিজেদের (মুখের) উপর নামিয়ে দেয়।” [সূরা আহযাব : ৫৯]
‘জিলবাব’ বলতে বোঝানো হয়েছে বড় চাদর, যা মুখমন্ডল ও পূর্ণ দেহ আবৃত করতে সক্ষম। [আলজামি লিআহকামিল কুরআন, কুরতুবী ১৪/২৪৩]।
মুসলিম উম্মাহর শত শত বছর ধরে দ্বীনদার নারীরা এই বিধান পালন করে আসছেন। পরপুরুষের সামনে মুখমন্ডল আবৃত রাখা কুরআন–সুন্নাহর স্পষ্ট বিধান। সূরা আহযাব (৩৩) ৩৩, ৫৩ ও ৫৯, সূরা নূর (২৪) ৩১ এবং সহীহ বুখারী ও মুসলিমসহ অন্যান্য হাদীসের কিতাব এ প্রথাকে সমর্থন করে।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন—“আল্লাহ তাআলা মুমিনদের নারীদের আদেশ করেছেন, তারা যেন ঘর থেকে বের হওয়ার সময় মাথা থেকে চাদর টেনে সম্পূর্ণ মুখমন্ডল আবৃত করে, শুধু এক চোখ খোলা রাখে।”
ইমাম আবু বকর রাযী আল জাসসাস রহিমাহুল্লাহ লিখেছেন—“এই আয়াত থেকে প্রমাণ হয়, বাইরে বের হওয়ার সময় নারীর মুখমন্ডল আবৃত রাখা অপরিহার্য, যাতে দুষ্ট লোকদের দৃষ্টি আকর্ষণ না হয়।” [আহকামুল কুরআন, জাসসাস ৩/৩৭২; আলকাশশাফ, যামাখশারী ৩/৩৭৪; তাফসীরে বায়যাবী ২/২৮০; তাফসীরে জালালাইন ৫৬০]
হাদিসে নিকাবের প্রমাণ
নিকাব পরিধান করার বিধান সহীহ হাদীস দ্বারাও প্রমাণিত। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘ইহরাম গ্রহণকারী নারী যেন নিকাব ও হাতমোজা পরিধান না করে।’ [সহীহ বুখারী ৪/৬৩, হাদীস : ১৮৩৮]
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, নবীজীর যুগে নারীরা সাধারণ অবস্থাতেও হাত ও মুখ আবৃত রাখতেন, আর ইহরামের বিশেষ প্রেক্ষাপটে নিকাব ও হাতমোজা পরা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
কাযী আবু বকর ইবনে আরাবী বলেন—
“নারীর জন্য বোরকা দ্বারা মুখমন্ডল আবৃত রাখা ফরজ; তবে হজ্বের সময় এটি ব্যতিক্রম। কারণ এ সময়ে তারা ওড়নাটি চেহারার উপর ঝুলিয়ে রাখবে, কিন্তু পরপুরুষ থেকে নিজেদের দূরে রাখবে এবং পুরুষরাও তাদের থেকে দূরে থাকবে।” [আরিযাতুল আহওয়াযী ৪/৫৬]
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. বলেন—
“ইহরামের সময়ে যখন কাফেলা আমাদের পাশ দিয়ে যেত, আমরা চেহারার ওপর ওড়না টেনে দিতাম; তারা চলে গেলে তা সরিয়ে নিতাম।” [মুসনাদে আহমাদ ৬/৩০; ইবনে মাজাহ, হাদীস: ২৯৩৫]
ফাতিমা বিনতে মুনযির রাহ. বলেন, আমরা আসমা বিনতে আবু বকর রাযি.-এর সাথে ইহরাম অবস্থায় থাকাকালে আমাদের মুখমন্ডল ঢেকে রাখতাম। মুয়াত্তা, ইমাম মালেক ১/৩২৮; মুসতাদরাকে হাকেম ১/৪৫৪
অন্য রেওয়ায়েতে এসেছে, আসমা বিনতে আবু বকর রাযি. বলেন, আমরা পুরুষদের সামনে মুখমন্ডল আবৃত করে রাখতাম। ..মুসতাদরাকে হাকেম ১/৪৫৪
ফুকাহায়ে কেরামের মতামত
আল্লামা ইবনে তাইমিয়া রাহ. বলেন—“পরপুরুষের সামনে দুই হাত, দুই পা ও মুখমন্ডল খোলা রাখার অবকাশ নেই।” [মাজমূআতুল ফাতাওয়া ২২/১১৪]
ইবনুল কাইয়্যেম রাহ. বলেছেন—
“নামাজের সময় দুই হাত ও মুখ খোলা রাখা যায়, কিন্তু বাজার বা জনসমাগমে তা গ্রহণযোগ্য নয়।” [ই’লামুল মুয়াক্কিয়ীন ২/৪৭]
আধুনিক আরব শায়খগণও একই মত পোষণ করেছেন—শায়খ ইবনে বায, শায়খ উছাইমীন ও শায়খ ইবনে জিবরীন। [রিসালাতুন ফিলহিজাবি ওয়াসসুফূর, পৃ.১৯; ফাতাওয়া উলামাইল বালাদিল হারাম পৃ. ১১৬৯]
বোরকা, যা বাইরে বের হওয়ার সময় পরা হয়, এটি এমনভাবে পরা উচিত যাতে মুখমন্ডল সম্পূর্ণ আবৃত থাকে।
এখানে চার মাযহাবের কিছু বিখ্যাত গ্রন্থের নাম উল্লেখ করছি, যেগুলোতে চেহারা আবৃত রাখার বিধান পরিষ্কার ভাষায় উল্লেখিত হয়েছে।
১. হানাফী মাযহাব : আহকামুল কুরআন, আল- জাসসাস ৩/৩৭১-৩৭২; ফাতাওয়া কাযীখান ৩/৪০৭; আদ্দুররুল মুখতার (রদ্দুল মুহতারের সাথে), ৬/৩৭০; রদ্দুল মুহতার (ফতওয়া শামী) ১/৪০৬; আলবাহরুর রাইক ২/২৭০
২. মালেকী মাযহাব : আহকামুল কুরআন, ইবনুল
আরাবী ৩/১৫৭৯; আলজামি লিআহকামিল কুরআন, কুরতুবী ১২/১১৫; আকরাবুল মাসালিক, আহমদ দরদীর ১/২৮৯; আরিজাতুল আহওয়াযী, ইবনুল আরাবী ৪/৫৬; মাওয়াহিবুল জলীল, হাত্তাব ২/১৮১; হাশিয়াতুদ দুসূকী, মুহাম্মাদ আদ দুসূকী ১/২১৪
৩. শাফেয়ী মাযহাব : রওযাতুত তালেবীন ৭/২১; হাওয়াশিশ শিরওয়ানী ২/৩৩৩
৪. হাম্বলী মাযহাব : আল আদাবুশ শরইয়্যা, ইবনু মুফলিহ ১/২৯৭; আলমুগনী, ইবনে কুদামা ২/৩২৮; আলইনসাফ, মারদাভী ১/৪৫২
শরীয়তের এমন সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান সম্পর্কে বিভ্রান্তি ছড়ানো অত্যন্ত ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক। তাই মুসলিম উম্মতের দায়িত্ব হলো মিডিয়া বা সামাজিক প্রচারে বিভ্রান্ত না হয়ে, সবসময় বিজ্ঞ ও খোদভীরু আলিমের পরামর্শ অনুযায়ী চলা।
